মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

সন্দ্বীপের অতীত গৌরব

সন্দ্বীপের অতীত গৌরব

রাজকুমার চক্রবতী

অনঙ্গ মোহন দাশ

বঙ্গদেশে ”বেঙ্গলা” নামক একটি নগর ছিল। বাণিজ্য,ঐশ্বর্য্য ও শিল্পসম্পদে ঐ নগরী দেশ-বিশ্রুত। কেহ উহাকে গৌড়, কেহ চট্টগ্রাম, কেহবা ইহাকে পিপ্পলী বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া গিয়াছেন। ইতিহাস পাঠক মাত্রই ঐ নগরীর গৌরবের কথা শুনিয়া থাকিবেন। ষোড়শ শতাব্দীতে ঐরূপ সমদ্ধশালী লোক-কোলাহলপূর্ণ সৌধমালা-পরিশোভিত নগরি বঙ্গদেশে অতি অল্পই বর্তমান ছিল। বঙ্গদেশের প্রধান বাণিজ্য স্থান ও নানা দেশীয় বণিকের আবাসভুমি বেঙ্গলা নগরী-দর্শনে পাশ্চাত্য পরিব্রাজকগণ ততসম্বন্ধে যে সব বিবরণ রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা আমাদের প্রাচীন শিল্প ও বাণিজ্যের গৌরবের কথা বটে।

ব্যজার (Badger) প্রমুখ অনেক ঐতিহাসিকের মতে উক্ত বেঙ্গল নগরী (Bengala) সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার মধ্যে অবস্থিত ছিল বলিয়া সিদ্ধান্ত হইয়াছে । এই সিদ্ধান্ত ঠিক হইলে হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মধ্যস্থিত সুপ্রসিদ্ধ সহর কসবা যে বেঙ্গলা বলিয়া কথিত হইয়াছে, তাহাতে সন্দেহ নাই। সহর কসবা অনেক দিন হয় হাতিয়া নদীর কুক্ষিগত হইয়াছে। নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর থানার অধীন এখনও ‘সহর কসবা’ নামক একটা গ্রাম আছে। ঐ গ্রামে স্বনামখ্যাত বক্সা আলী চৌধুরীর বাড়ী । আমাদের অনুমান, যদি ব্যাজার সাহেবের উক্তির কোন সত্যতা থাকে, তবে উহাই হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মধ্যস্থ ‘সহর কসবার’ সিকস্তীর পয়স্তী। একদিন সন্দ্বীপ বর্তমান সহর কসবা গ্রামের অনেক উত্তর পর্য্যন্ত বিসতৃত ছিল।

যাহা হউক, সন্দ্বীপের গৌরব কেবল সহর কসরা বা বেঙ্গলা নগরীতে পর্য্যবসিত নহে । সন্দ্বীপ কৃষকের দেশ, শস্য ইহার প্রধান সম্পদ । ১৫৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ভ্রমণকারী সিজর ফ্রেডারিক ইহাকে পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ উর্ব্বর দ্বীপ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া গিয়াছেন। এমন কি, সন্দ্বীপের বর্ষাপাবিত অত্যুর্ব্বর অকৃষ্ট ক্ষেত্রে সময় বুঝিয়া এক মুষ্টি ধান ছড়াইয়া দিতে পারিলে যথাকালে শস্য-রাজিতে গৃহস্থের গৃহপ্রাঙ্গণ পূর্ণ হইয়া যাইত,পশ্চাত্য পরিব্রাজকেগণ উহা স্বচক্ষে দেখিয়া মোহিত হইয়াছিলেন। সন্দ্বীপের অসংখ্য নারিকেল গাছে প্রচুর নারিকেল জন্মিত। কৃষকেরা সরিষা ও তিলের চাষ করিত অযত্ন সম্ভুত পুন্যাল গাছে অপরিমিত ফল পাওয়া যাইত। গৃহস্থরা নিজ বাড়ীতে সরিষা, নারিকেল,তিল ও পুন্যাল নিষ্পেষিত করিয়া তৈল বাহির করিত। নারিকেল ও তিল তৈল রমণীদের কেশরঞ্জনের জন্য ব্যবহৃত হইত। পূন্যাল তেল গৃহস্থের গৃহের অন্ধকার দূর করিত।এ সকল দ্রব্য আজকাল আর তেমন পাওয়া যায়ন না। পূর্ব্বে গৃহস্থের বাস ভবনের চারিদিকের তুলা গাছে অপর্য্যাপ্ত তুলা ফলিত । ঐ সকল দুলা দ্বারা গৃহিনীর চরকার সাহায্যে সূত্র নির্ম্মিত হইত। ঐ সব সূত্রে তন্তবায়ের বাড়ী হইতে গৃহস্থের প্রয়োজনীয় বস্ত্র নির্ম্মিত হইয়া আসিত। ঢাকার কারুকার্য্য-সম্বলিত বস্ত্র-শিল্প এখানে না থাকিলেও এদেশবাসীরা নিজস্ব পরিধেয় বস্ত্রের জন্য অন্যের গলগ্রহ হইত না। এ দেশের বস্ত্র-শিল্প ও তন্তুবায়গণ একদিন দেশ বিখ্যাত ছিল। গৃহিনীর সাধের সামগ্রী লবণ সন্দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে পাওযা যাইত। উহাতে কেবল সন্দ্বীপ নহে বঙ্গদেশের কি ধনী কি নির্ধন সকলেই সন্দ্বীপের লবণে তাহাদের খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ বৃদ্ধি করিত। এমনকি প্রতি বৎসর তিনশত খানি লবণের জাহাজ সন্দ্বীপ হইতে অন্যত্র প্রেরিত হইত । যখন স্থানীয় জমিদারদের হাতে লবণের ব্যবসা একচেটিয়া ছিল, তাহাদের ১৭৭৬ খ্রীষ্টাব্দে পঞ্চম বার্ষিক রিপোর্ট দেখা যায়, সন্দ্বীপে প্রতি বৎসর একলক্ষ ত্রিশ হাজার (১,৩০,০০০) মণ লবণ তৈয়ার হইয়াছে। আজও রাজবিধি দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হইলে বঙ্গদেশের লবণের জন্য আমাদিগকে লিভারপুলের দ্বারস্থ হইতে হইত না।

প্রাচীনকালে বাষ্প ও তড়িৎ-শক্তি প্রয়োগের পূর্ব্বে সকল দেশের বাণিজ্যোন্নতি নৌ-বিদ্যা ও নৌ-শিল্পের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাঙ্গালীদের নৌ-শিল্প বিশ্ব-বিশ্রুত । সন্দ্বীপবাসিগণ যুগপৎ নৌ-বিদ্যা ও নৌ-শিল্পের পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া গিয়াছে। তাহারা সুন্দর ও মজবুত জাহাজ নির্মাণ করিতে জানিত এবং অবলীলাক্রমে তাহাদের স্বনির্মিত অর্ণবপোতে মহাসমুদ্র অতিক্রম করিত। চীন,জাপান, সুমাত্রা, জাভা , ব্রহ্ম প্রভৃতি দেশে ইহারা লবণ ও কাপড়ের বাণিজ্য করিত এবং বাণিজ্য-ব্যপদেশে ইহারা আরব সাগর উত্তীর্ণ হইয়া আফ্রিকা গমন করিত। সন্দ্বীপের বাণিজ্য কেবল এশিয়ায় নহে, সুদূর ইউরোপ ভূ-খণ্ডেও উহার প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। ইহাদের শিল্প-নৈপুণ্যে মুগ্ধ হইয়া তুরস্কের সুলতানও একদিন তাহার জাহাজগুলি সন্দ্বীপে নির্ম্মাণ করাইতেন। ইহা সন্দ্বীপের কম গৌরবের কথা নহে। তাহাদের সন্তান-সন্ততিগণ আজকালও জাহাজ ও স্টিমারের চাকুরী-ব্যপদেশে তাহাদের পূর্বপুরুষদের সেই গৌরব অক্ষুণ্ন রাখিয়াছে। বাঙ্গালীদের নৌ-শিল্প সত্যই সন্দ্বীপে পরিষ্ফুট হইয়াছিল। এখনও তাহারা তাহাদের বেতের বাঁধা ‘বালাম’ নৌকার সাহায্যে বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করিয়া ব্রহ্মদেশে গমন করতঃ নানা প্রকার ব্যবসায় বাণিজ্য করিয়া থাকে। ভারতের নদী পথের স্টিমারের সেরাঙ্গ ও সমুদ্র পথের বড় বড় স্টিমারের শুকানি প্রভৃতি লস্করের কাজ আজিও সন্দ্বীপবাসীর একচেটিয়া । ইহারা স্টিমার ও জাহাজ চাকুরী উপলক্ষে আজও পৃথিবীর নানা স্থান ভ্রমণ করিয়া তাহাদের নৌ-বিদ্যার পরিচয় প্রদান করিতেছে।

সন্দ্বীপ শুধু সুজলা সুফলা নহে । ইহা বহু বীর পুরুষেরও জন্ম স্থান । একদিন ইহার কাস্তেধারী কৃষকগণ কামান ও বন্দুক পরিচালনেও সিদ্ধহস্ত ছিল। দিলাল, ফতেখাঁ, মানিকচাঁদ প্রভৃতি বীরগণ যেরূপভাবে যুদ্ধ করিয়া স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জ্জন দিয়াছেন, তাহা বস্তুতঃই বীরের কার্য্য। সে বেশীদিনের কথা নহে, ১৭৬৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ বীর নলিকিন্সের (Captain Nalikins) সহিত সন্দ্বীপের জমিদার আবুতোরাপ চৌধুরী যেরূপভাবে যূদ্ধ করিয়াছেন, তাহা প্রকৃতই সন্দ্বীপের গৌরবের কথা। এতবড় প্রবল শক্তির নিকটও সামান্য একজন জমিদার পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করেন নাই। একদিন এ সকল জমিদারের পরাক্রমে স্থলে ও জলে মগ-ফিরিঙ্গী, মোগল প্রভৃতির অদ্বিতীয় শক্তিও হতমান হইয়াছিল । সুখের বিষয়, বিগত জার্ম্মান যুদ্ধেও বহু সংখ্যক সন্দ্বীপবাসী জীবন বিসর্জন করিয়া তাহাদের পূর্ব্বপুরুষের সে গৌরব রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছেন।

সন্দ্বীপের প্রধান ফসল ধান্য হইলেও খেসারী, মুগ, তুলা, ইক্ষু প্রভৃতিরও এখানে প্রচুর চাষ হইত । অনেক দিন হইল এদেশ হইতে তুলার চাষ উঠিয়া গিয়াছে । ইক্ষুর চাষ এখনও হয় কিন্তু আর পূর্বের ন্যয় নহে। ইক্ষু হইতে এদেশে এ প্রকার রাবগুড় তৈয়ার হইত, উহা খাইতে মধুর ন্যায় রসনা-তৃপ্তিকর ছিল। এই গুড়ের জন্য সন্দ্বীপ একদিন প্রসিদ্ধ লাভ করিয়াছিল।

জিনিসপত্রের মূল্য সম্বন্ধে সন্দ্বীপের অতীত ইতিহাস স্মরণ করিলে তাহা কতকটা অলীক বলিয়া মনে হইবে । ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দেও এদেশে টাকায় পাঁচ কাটা করিয়া ধান্য বিক্রয় হইয়াছে। বেশী দিনের কথা নহে; ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে এদেশের ধানের মণ সাত আনা ও চাউলের মণ একটাকা দুইআনা ছিল। গরু মহিষের মুল্যের কথা শুনিলে আরও অবাক হইতে হয়। ভিনিষ দেশীয় পরিব্রজক সিজর ফ্রেডারিক ১৫৬৫ খ্রীষ্টাব্দে এদেশে আসিয়াছিলেন। তিনি একটি গরু ও একটি মুরগী খরিদ করিয়া যখন বিক্রেতার নিকট ইহাদের মূল্য দেড় টাকা তিন পয়সা শুনিলেন, তখন এত অল্প মূল্য দিতে তিনি লজ্জাবোধ করিয়াছিলেন। সন্দ্বীপের জমিদার স্বনামখ্যাত সরাফত আলী চৌধুরীর ১২৬০ সালের নিকাশে দেখা যায়, তিনি ১১ টাকা দিয়া দু’টি হালের মহিষ এবং ৪ টাকায় একটি দুগ্ধবতী গাভী খরিদ করিয়াছিলেন । প্রচুর খাদ্য ও জলবাযূর প্রভাবে অতীত সন্দ্বীপে লোকের স্বাস্থ্য, ঐশ্বর্য্য ও ধর্মভাব যথেষ্ট ছিল । তাহাদের সেই সুদূর অতীতের দিনগুলি তাহারা কি সুখে অতিবাহিত করিয়াছিলেন,তাহা ভাবিতেও আনন্দ হয় । একদিন সন্দ্বীপের ঐশ্বর্য্যে মুগ্ধ হইয়া ইয়োরোপের পর্তুগীজ, আরাকানের মগ, বাঙ্গলার বারভূঁঞা এবং মোগল-পাঠানগণ যুদ্ধ করিয়া সন্দ্বীপের নীল জলধি রঞ্জিত করিয়াছিল । বর্তমানে সন্দ্বীপের অবস্থা পর্যালোচনা করিলে সেইসব গৌরব কাহিনী আরব্যোপন্যাসের গল্পের ন্যায় প্রতিভাত হয়। আমাদের কেবলি মনে হয়, সন্দ্বীপের সে দিন কোথায়?